সওমের সামাজিক কল্যাণ যে অনাহারী-অর্ধাহারী গরীব-মিসকীনদের কষ্ট উপলব্ধি করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসম্য রক্ষা করা এবং আনন্দ-বেদনায় সহমর্মীতার ভূমিকা পালনের সুমহান শিক্ষা দেয়; সেকথা আমরা পূর্বেই জেনেছি। মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বড় আনন্দোৎসব দুই ঈদ- 'ঈদুল ফিতর' ও 'ঈদুল আযহা'। কিন্তু এমন পরিবারের সন্ধান করতে হবে না; বরং আমাদের চারপাশে উন্মুখ হয়ে আছে সেসব কচি-কোমল মুখগুলো, যারা অপেক্ষায় আছে সেই আনন্দ দিনের, যেদিন পেট ভরে ভাত খাবে, যেদিন কিছু গোশ্ত খেতে পাবে, যেদিন একটা নতুন জামা আসবে। আর অন্যদিকে তো রয়েছে দাতাদের আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের মহা সাফল্য। এক মাসের সিয়াম পালন করতে গিয়ে জানা-অজানায় হয়ে গেছে কত মিথ্যাচার, দৃষ্টির পাপ, শ্রবনের পাপ এবং বিবিধ। অবহেলায় বাদ পড়ে গেছে কতই না কল্যাণ; যারা এই পবিত্র মাসের প্রতিটি দিনে-ক্ষণে এসে এসে কড়া নেড়েছিল আমাদের হৃদয়-বিবেকের দরজায়। কিন্তু পেরেছি কি পুরোপুরি সাড়া দিতে, পেরেছি কি অর্জন করতে সওয়াব-সাফল্যের সবটুকু? বরং ভাবনা-ক্লান্ত মন অস্থির; কতইনা অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত যে মাসে নিহিত, সে মাসের ইবাদাতে।
দুর্বল মানুষ আমরা, এই পরমুখাপেক্ষী মানুষকে পবিত্র করতে এবং পারস্পরিক আর্থিক-আনন্দিক সমতা অর্জনের লক্ষ্যেই সিয়ামের এক মাসের শেষ দিকে দয়াময় আল্লাহ্ আমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন এক সুন্দর ও সহজসাধ্য ব্যবস্থা, যার নাম 'ফিতর'। এ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা আমাদের কাছে তুলে ধরেন নিন্মোক্ত হাদীসে; যেখানে তিনি বলেনঃ ((রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম পালনকারীকে অনর্থক কথা ও অশ্লীল ব্যবহার থেকে পবিত্র করা এবং গরীবদের মুখে অন্ন দেয়ার জন্য ফিতর ফরয করেছেন।)) [সহীহ্ ইবনে মাজাহঃ ২/১১১, হাদীস-১৮৫৪]
কারা আদায় করবেনঃ এই ফিতর সকল মুসলমানের উপর ফরয, চাই সে যে কোন পর্যায়েরই হোক না কেন। অর্থাৎ, ধনী-গরীব, গোলাম-আযাদ, পুরুষ-মহিলা, ছোট-বড়, সিয়াম পালনকারী-না পালনকারী, নেছাব পরিমাণ সম্পদের মালিক-সে পরিমাণ সম্পদের মালিক নন; সকলের উপরই এটা ফরয। আমরা এর বর্ণনা পাই আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণিত হাদীসে, যেখানে তিনি বলেনঃ
((রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের ফিতর হিসেবে এক ছা' খেজুর অথবা এক ছা' যব, গোলাম, আযাদ, পুরুষ, মহিলা, ছোট, বড় প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয করেছেন।)) [সহীহ্ আল-বুখারীঃ ২/৬০, হাদীস-১৪১৫] এ ব্যাপারে উলামাদের মতামত হলো- যে ব্যক্তির কাছে একদিন এক রাতের খোরাক নাই; তাকে ফিতর আদায় করতে হবে না।
যারা এখনো ছোট অর্থাৎ, নিজস্ব অর্থকড়ি নেই বা উপার্জনের বয়স হয়নি, তাদের সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের আসহাবদের ভূমিকা সম্পর্কে নাফে' বলেনঃ ((ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা ঘরের ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকেই ফিতর আদায় করতেন। এমনকি আমার ছেলেদের পক্ষ থেকেও আদায় করতেন।)) [সহীহ্ আল-বুখারীঃ ২/৫৯, হাদীস-১৪১৪]
কি আদায় করবেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেনঃ ((আমরা ফিতর হিসেবে এক ছা' খাদ্য, ফসল অথবা এক ছা' খেজুর বা এক ছা' যব বা এক ছা' মোনাক্কা বা এক ছা' পনির দিতাম।)) [সহীহ্ আল-বুখারীঃ ১৪০৯] ফিতর আদায় করতে গিয়ে অনেকেই উল্লেখিত পরিমাণের মূল্য টাকায় আদায় করে থাকেন। তবে হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী খাদ্যদ্রব্য বা শষ্য ফসল থেকে দেয়াই উত্তম। এ ব্যাপারে অবশ্য উলামাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন- মূল্য আদায় অর্থাৎ, টাকা দিয়ে আদায় করা ঠিক হবে না, আবার অনেকেই বলেছেন- সুন্নাতের অনুসরণ হবে না কিন্তু ফিতর আদায় হয়ে যাবে। বর্তমানে ইসলামী বিশ্বের দুই পবিত্র স্থান মক্কা ও মদীনায় চাল দিয়ে আদায় করাটাই বেশী লক্ষণীয় এবং আমাদের প্রধান খাদ্য হিসেবেও তা সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত।
কখন আদায় করতে হবেঃ এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেনঃ ((যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করেছে, তার ফিতর আদায় হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পর আদায় করলো, তার জন্য তা সাধারণ সদকায় পরিণত হবে।)) [সহীস্ ইবনে মাজাহঃ ১৮৫৪] আর ঈদের সালাতের পূর্ব বলতে ফিতর আদায়ের সময় শুরু হয় রমাদানের সর্বশেষ সওমের ইফতারীর পর থেকে অর্থাৎ, ঈদের আগের দিন মাগরিবের পর থেকে নিয়ে ঈদের সালাতের পূর্ব পর্যন্ত হলো সঠিক সময়। তবে নাফে' আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা সম্পর্কে বলেনঃ ((. . . . তিনি (ইবনে উমার) ঈদের দু'একদিন পূর্বেই (ফিতর) আদায়
করে দিতেন।)) [বুখারীঃ ১৪১৪]। এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, উপরোল্লেখিত সময়ের পূর্বেও দেয়া যাবে।
কারা নেবেনঃ সংক্ষেপে যারা যাকাত নেয়ার অধিকারী, তারাই ফিতর নেয়ারও অধিকারী। এছাড়া এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমার কার্যক্রম বর্ণনা প্রসঙ্গিত হাদীসে নাফে' বলেনঃ ((ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ঐ সকল ব্যক্তিদেরকে (ফিতর) দিতেন, যারা তা গ্রহণ করতো।)) [বুখারীঃ ২/৫৯, হাদীস-১৪১৪] আল্লাহ্ই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আত্মশুদ্ধির এই পবিত্র মৌসুমের শেষ লগ্ন এসে গেছে। চারদিক থেকে যেন ধ্বনিত হচ্ছে- বিদায় রমাদান! বিদায় কল্যাণের মৌসুম!! পূর্ববর্তী পূণ্যবানগণ রমাদানে দো'আ করতেন- যেন শেষ পর্যন্ত হায়াত লাভ করেন আর রমাদানের পর দো'আ করতেন- যেন পরবর্তী রমাদান পর্যন্ত হায়াত লাভ করেন এবং এর যাবতীয় কল্যাণ অর্জন করেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ আমাদেরকে তাদের মত পবিত্র করুন, কল্যাণ লাভ করার তৌফিক দান করুন এবং আজকের আলোচ্য বিষয়- ফিতরকে সঠিকভাবে আদায়ের মাধ্যমে আত্মিক পবিত্রতা এবং সামাজিক সৌহার্দতা অর্জন করা তৌফিক দিন। আমীন।
-ফজলে এলাহি মুজাহিদ। ২০.১০.২০০৬, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব।
© - এই সাইটের সকল লেখার স্বত্ব লেখক কতৃর্ক সংরক্ষিত ।