জীবনের প্রয়োজনে সময়ের সবটুকুতেই আমাদেরকে কর্ম সাধন করতে হয়। অন্যকথায় জীবন মানেই কাজ, অবসরও এক ধরণের কাজের পর্যায়ে পড়ে। প্রতিটি কাজের ধারনা অথবা আদেশ অথবা প্রারম্ভ প্রক্রিয়া যেখান থেকেই আসুক না কেন, সিদ্ধান্ত নিতে হয় ব্যক্তিকেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে এ নিয়ে ভাবতে হয়, ভাল-মন্দ ফলাফলেরও একটা অগ্রিম রূপ দেখে নেয় মনে মনে। এঁকে নেয় কর্মনীতি ও কর্মপন্থার রূপরেখা। তবে সবকিছুই নির্ভর করে এমন এক মৌলিক গুণের উপর, যার নাম নিয়ত বা সংকল্প অথবা ইচ্ছা। এই নিয়ত বা ইচ্ছার প্রেক্ষিতেই মোড় নেয় কাজের ধরন, গতি, ধারা এবং ফলাফল। ভাল ও মন্দ কাজের শুরুটা মূলত নিয়তের দ্বারাই হয় এবং ইচ্ছার প্রভাবেই বিভাজিত হয়।
ইখলাস বলতে যা বুঝায় তা হলো ইচ্ছার স্বচ্ছতা বা একনিষ্ঠতা। পৃথিবীর যে কোন আদর্শে, যে কোন কাজে-চাই তা ভাল হোক কিংবা মন্দ-ইখলাসই পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের দোর গোড়ায়। দোর গোড়ায় এ জন্য যে, অনেক ক্ষেত্রে কোন কার্যের সফলতা ভাগ্যে না থাকলে সঠিক ইখলাস ও কর্মতৎপরতা সত্ত্বেও ব্যক্তি ব্যর্থ হয়। এটা একান্তই তাকদীরের বিষয়। কিন্তু ব্যক্তির উচিত যে কর্ম সাধন করার ইচ্ছা বা নিয়ত করেছে, তাতে পরিপূর্ণ আন্তরিক হওয়া, বিশুদ্ধতা পোষণ করা। আর সৎকার্যাবলীর ক্ষেত্রে তো এর কোন বিকল্প নেই। কেননা, সৎকাজ আল্লাহর নিকট কবূল হওয়ার প্রধান শর্তই হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ((মহান আল্লাহ্ তোমাদের শরীর ও আকৃতির দিকে দেখেন না; বরং তোমাদের হৃদয় ও কর্মের দিকে তাকান।)) [আবূ হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেন, মুসলিম: ২৫৬৪] এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট যে, শারিরিক সৌন্দর্য-সবলতাই যথেষ্ট নয়; বরং আন্তরিক ইচ্ছা, একনিষ্ঠতা এবং কর্মতৎপরতাই আল্লাহর নিকট প্রিয়-অপ্রিয় হওয়ার মাপকাঠি।
ভাল কাজ কমবেশী সকল মানুষই করে থাকে। যারা দুনিয়ার জীবনকেই একমাত্র জীবন মনে করে, মৃত্যুকেই মানবের নিঃশেষ বলে বিশ্বাস করে কিংবা সত্যদ্বীনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের সৎকর্মের ফলাফল কোন না কোনভাবে আল্লাহ্ দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। কেননা, আখেরাতে প্রতিদান পেতে হলে শর্ত হলো সৎকর্মের সাথে ঈমানের সংযুক্তি। অতএব, যারা সৎকর্ম শুধুমাত্র জনকল্যাণ, সততার বহিঃপ্রকাশ কিংবা একান্ত নিজস্ব প্রয়োজনে সম্পাদন করে থাকে তারা পার্থিবতায় যা পায় একজন ঈমানদার ব্যক্তিও তা থেকে বঞ্চিত হন না। পার্থক্য হলো মুমিন ব্যক্তি তার ঈমানের দাবী হিসেবে, তার প্রভূর আদেশ হিসেবে এবং তার আখেরাতের পুঁজির অতিরিক্ত কিছু হিসেব করেই সৎকর্মের নিয়ত বা ইচ্ছা করে থাকে। তাই উভয়ের কর্ম এক হলেও প্রতিদানের পার্থক্য ব্যাপক। তদুপরি মুমিনগণের মধ্য হতে কেউ যদি সৎকর্মের জন্য অসৎ নিয়ত বা ইচ্ছা পোষণ না করে, কপটতা করে, কুটকৌশল সম্পাদনের জন্যই সৎকর্ম করে কিংবা ইত্যকার যাবতীয় ইখলাস পরিপন্থী ইচ্ছার ফলশ্রুতিতে সৎকর্ম সম্পাদন করে, তবে তার এই সৎকর্ম দুনিয়ার উদ্দেশ্য সফল করতে পারলেও আখেরাতে তা কোনই কাজে আসবে না; বরং অসৎ উদ্দেশ্যে সাধিত সৎকর্মই তার জন্য পাপ বয়ে আনবে ও জাহান্নামের কারণ হয়ে যাবে।
কর্মের সাথে ইখলাসের সংযোজন যে কত বড় মহা সাফল্য এনে দিতে পারে মুমিনের ইহ ও পরজীবনে তা নিন্মের হাদীস হতে অনুধাবন করা যাবে: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ((রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রব হতে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন: আল্লাহ্ ভাল এবং মন্দ লিখে দিয়েছেন, তারপর তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। অতএব, যে কেউ কোন সৎকাজের ইচ্ছা করে তা না করলেও আল্লাহ তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেবেন। আর যদি সে সৎ কাজের ইচ্ছা করে এবং বাস্তবে তা করেও ফেলে, আল্লাহ্ তার জন্য দশ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত; এমনকি এর চেয়েও অধিক সওয়াব লিখে দেন। আর যে কেউ কোন মন্দ কাজের ইচ্ছা করার পর যদি তা না করে, তবে আল্লাহ্ তার বিনিময়ে তাকে পূর্ণ কাজের সওয়াব দেন। পক্ষান্তরে যদি সে মন্দ কাজের ইচ্ছা করে এবং কাজটা করেই ফেলে, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য একটি মাত্র গোনাহ্ লেখেন।)) [বুখারী: ৬৪৯১, মুসলিম: ১৩১]
সোবহান আল্লাহ্! সুমহান প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের জন্য কত দয়াময়। কত অনুগ্রহশীল! যদি আমরা তা বুঝতে পারতাম।
-ফজলে এলাহি মুজাহিদ। ১৭.০৭.২০০৭, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব।
© - এই সাইটের সকল লেখার স্বত্ব লেখক কতৃর্ক সংরক্ষিত ।