ইতিহাসের তরবারীতে পৃথিবীর ব্যবচ্ছেদThis is a featured page

দাঙ্গা-যুদ্ধ-বিগ্রহ-হত্যা পৃথিবীর ইতিহাসের এমন একটি অংশ দখল করে আছে, যেমনটি আছে একটি জীবনের-একটি শরীরের। দু’টোই ইতিহাসের সমৃদ্ধিতে পরস্পরের পরিপূরক আর এই পরিপূর্ণতায় বিরাজ করছে তিনটি প্রকার-
১) পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য, ২) জাগতিক লোভ-লালসার জন্য এবং ৩) অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রাণান্ত লড়াইয়ের মাধ্যমে ইহ ও পর জীবনের শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত ‘মর ও মার’ লড়াই।


প্রথমতঃ বেঁচে থাকার লড়াইকে আমরা মানবিকতার সাধারণ পর্যায়ে ফেলতে পারি, অতি সাধারণ-ব্যাপক, যার সাথে পরিচয়, যার শৈলী জানা আছে প্রতিটি মানুষেরই এবং এটা বাস্তব ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কল্যাণকর। যার উদাহরণ আমাদের প্রতিটি জীবন, প্রতিটি সংসার-পরিবার। এই বাঁচার লড়াইও কখনো কখনো অকল্যাণের হয়ে দাঁড়ায়, যদি সে বেঁচেথাকায় জড়িত থাকে পৃথিবীর অকল্যাণ, সমাজের, মানবতার অকল্যাণ। তথাপি ধারণকৃত সেই প্রাণ-আত্মার কাছে লড়াইয়ের আত্মপক্ষটাকেই যুক্তিযুক্ত ও কল্যাণের মনে হয়। সুতরাং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এই প্রথম পর্যায়ে সাধারণভাবে পৃথিবীর দু’ভাগে বিভক্ত। একভাগে রয়েছে অধিকাংশ শান্তিপ্রিয় জীবনযোদ্ধা; জীবনের মৌলিক প্রয়োজনেই যাদের লড়াই করতে হয় সারাটি জীবন-জুড়ে।

অন্যভাগে রয়েছে দুষ্টপক্ষ, অর্থলিপ্সা, ক্ষমতালিপ্সা, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধ-প্রতিঘাত ইত্যাদি এবং এসবের বাদীপক্ষ। সমস্ত কুটিলতা ও জটিলতার সুতোগুলো তাদের স্বল্পসংখ্যকের হাতেই এবং এগুলোর চালাচালও করে যাচ্ছে যাচ্ছেতাই নিজ নিজ কু-প্রবৃত্তির তাদের তৈরী সমস্যার সমাধানে; যা একটা সুষ্ঠু মানব-সমাজ কখনোই সমর্থন করে না। তারপর যখনি নিজেদের পাতা কিংবা নিয়তির বিপক্ষ সমর্থনের ফাঁদে আটকা পড়ে, তখনি দেখা দেয় তাদের বেঁচে থাকার এই লড়াইয়ের; যার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে আমাদের সমাজের দুষ্ট-গুণ্ডা-বদমাশদের জীবনে।

দ্বিতীয়তঃ জাগতিক লোভ-লালসার পর্যায়, যেখানে রয়েছ একটি সামান্য বিড়ি-সিগারেট থেকে শুরু করে বিকৃত শরীর-তৃষ্ণা হয়ে সাম্রাজ্য লালসা পর্যন্ত অর্থাৎ, এখানে মৌলিকতার বিভাজনে তিনটি রূপ স্পষ্ট- সম্পদ, অস্বাভাবিক ও বিকৃত লালসা এবং ক্ষমতালিপ্সা। উপমহাদেশের ইতিহাসে ‘ঠগী’দের কথা শোনা যায় যে, যারা কখনো কখনো সামান্য একটা উড়নার জন্যও এক-একটি প্রাণকে কেড়ে নিত নির্মম পন্থায়। উল্লেখ্য যে, এটাই ছিল তাদের আয়ের উৎস অন্যকথায় ভূরিভোজ, দেহাবরণ ও ছায়ার জৈবিক লালসা নিবারণের ঘৃণ্য উপায়। এছাড়াতো রয়েছে সম্পদের ভাগাভাগি, বুর্জোয়ার স্বপ্ন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাসহ সম্পদের অন্ত্র-প্রত্যন্ত্রে লুকিয়ে থাকা বিষবাষ্প; যা কিনা জন্ম দেয় প্রতিটি স্বার্থবাদী যুদ্ধের, হত্যাযজ্ঞের। সমাজের গুণ্ডা-বদমাশগুলোর অধিকাংশই এদের কারখানায় তৈরী হয় এবং এদের উদাহরণ খুঁজতে হলে ঘেঁটে দেখতে হবে পৃথিবীর অধিকাংশ ধনী-বুর্জোয়াদের সম্পদ-শীর্ষে পৌঁছানোর আড়ালগুলোকে; যা মোটেই সহজসাধ্য নয়। তবে এ রূপটিরও একটা বিরাট অংশ রয়েছে উত্তরাধিকার এবং সততার মাধ্যমে স্রষ্টা-প্রদত্ত অর্জন; যা একেবারেই অনস্বীকার্য।

মানুষের জৈবিক চাহিদা চরিতার্থ করার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি বাঁকেই ছিল সুষ্ঠু সামাজিক বিধি-বিধান; কখনো ধর্মের প্রত্যাদেশাশ্রয়ে, কখনো রাষ্ট্রিয় আইনের বিধানে। তারপরও বিকৃত মানসিকতা কখনোই এসবের ধার ধারেনি, প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সর্বযুগেই সে জ্বালিয়েছে অশান্তির আগুন, ঘটিয়েছে তার নির্লজ্জ প্রকাশ ঢাকতে দাঙ্গা-হত্যা ইত্যাদি। এসব বিকৃতিও বিভিন্ন রূপ থেকে রূপান্তরিত হয়েছে, যার পেছনটা ঘাঁটতে গেলে অজস্র গল্পোপন্যাসের সৃষ্টি হয়ে যাবে এবং যার বিস্তৃর্ণ ভয়াবহ তেপান্তর থেকে কিছু প্রকৃষ্ট প্রকাশ আমাদের সংবাদপত্রগুলো। কিন্তু যখনি ওরা ধরা পড়ে বিধির বিধানে, তখনি শুরু হয় এ লড়াইয়ের, টিকে থাকার, লাশের বিন্যাস-বিছানায় তৃপ্তির নিদ্রা-ভোগের লড়াই।

পরবর্তী শাখা ভাগটাই যেন পৃথিবীর ইতিহাস লেখার একমাত্র বিষয়, ইতিহাস মানেই সাম্রাজ্য লাভ-রক্ষা-বিস্তার লড়াইয়ের ইতিহাস। সিংহভাগ যুদ্ধের কারণটাই ছিল সাম্রাজ্যাধিপত্য বিস্তার, প্রাচীন থেকে সমকাল পর্যন্ত এর বহু উদাহরণেই ঠাসা এ সবুজ ভূ-খণ্ডের ইতিহাস। এছাড়াও ছিল ব্যক্তিগত পাওয়া-নাপাওয়া, ক্ষোভের প্রশমন, ছিল প্রেম-পাওয়া নিয়ে লড়াইও, মিসরের ক্লিওপাট্রাকে নিয়ে এমটি দেখতে পাই আমরা। অন্যায়-যুলুমের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতা-অধিকার লাভের লড়াইও একটা বিরাট অংশ দখল করে আছে; যার আলোচনা তৃতীয় প্রকারে আলোচিত।

তৃতীয়তঃ অন্যায়-অবিচার-যুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর্যায়। মূলতঃ লড়াই মানেই তো ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা-নিঃশেষ, তা যে কোন লড়ায়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; ন্যায়ের লড়াইও এর বাইরে নয়। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার মানুষের বিবেক সর্বদাই এ সাক্ষ্য ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, শান্তির জন্য, কল্যাণের জন্যই পৃথিবীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে দুষ্ট ও অকল্যাণের হাত থেকে। সে জন্য প্রয়োজনীয় একটি হত্যাও ফিরিয়ে দিতে পারে বহু প্রাণ ও প্রশান্তি। মহান আল্লাহ বলেনঃ “···ফেতনা হত্যার চেয়েও গুরুতর···” [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৯১] এই লড়াইও নিয়ে থাকে দু’টি রূপ- ক) স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের যুদ্ধ এবং খ) ধর্মযুদ্ধ। অত্যাচারীর শোষণ-নির্যাতনে যারা হয় নির্যাতিত তারা একে রূপ দেয় স্বাধীনতার, অধিকার আদায়ের যেমনটি হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সূচনায়। এতে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ বা পুরো অংশই হয়ে থাকে ভুক্তভোগীরা। এটা নিতান্তই মানবিক অধিকার হরণ হলে তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া হিসাবেই শুরু ও অর্জন কিংবা পতন হয়। এর ফলাফল শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অন্যদিকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইটা আপাতঃ দৃষ্টিতে মানবিক হলেও মানবতার দৃষ্টান্ত এ ব্যাপারে ্লান। ধর্মই মূলতঃ যুগে যুগে মানবতার আর্তনাদে সাড়া দিয়ে এ লড়াইয়ের সূত্রপাত করেছে এবং নির্যাতিত মানবতাকে অত্যাচারীর কবল থেকে মুক্তি দিতে হাসিমুখে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে ধার্মিক প্রাণগুলো। এখানে নির্যাতিতরাও অংশগ্রহণ করে তবে তুলনামূলকভাবে কম অথবা লড়াই শুরু হয়ে গেলে নির্যাতিত মানুষেরাই হয়ে যায় ধর্মের লড়াই দীক্ষায় দীক্ষিত। যার সর্বোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে ইসলামের ধর্মযুদ্ধগুলোতে। মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেনঃ
وَمَا لَكُمْ لا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيّاً وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيراً.
অর্থাৎ, “তোমাদের কি হল যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য, যারা বলেঃ ‘হে আমাদের রব! এ জনপদ- যার অধিবাসী যালেম, তা থেকে আমাদেরকে অন্য কোথাও নিয়ে যান; আপনার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক করুন এবং আপনার কাছ থেকে কাউকে আমাদের সহায় করুন।” [সূরা আন-নিসাঃ ৭৫]

মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধ-বিগ্রহের এ তৃতীয় পর্যায়ে এসে যে দু’টো ধারার সন্ধান আমরা পাই তার প্রথমটিতে যদি বিজয় আসে তাহলে তার ফলাফল পেতেও পারি আবার নাও পেতে পারি যেমন, আমাদের দেশের জনগণ আজ ৩৫ বছর পরও একথাটির সাক্ষ্যই দিচ্ছে। আবার দ্বিতীয় ধারায় সত্যিকার অর্থে কোন পরাজয়ই নেই, কারণ, তার লক্ষ্য থাকে দু’টি- যদি লড়াইয়ে বেঁচে যাই এবং বিজয় আসে তাহলে পার্থিব শান্তি-সমৃদ্ধি ও অনন্ত জীবনের প্রশান্তি দু’টোই অর্জিত হবে আর যদি মরে যাই তাহলে তো অনন্তটাই পেলাম; মূলতঃ তার কাছে অনন্তসুখই প্রধান ও আসল বিবেচ্য ব্যাপার হয়, পার্থিবসুখ সে তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ।

এসব কিছু মিলেই আমাদের জীবন বহমান, সময়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে আমাদের ভূমিকাগুলো হয় ইতিহাস। সবকিছুর জন্য আমরাই দায়ী, আবার ভিন্ন দৃষ্টি বলছে- সবকিছুর কলকাঠি নাড়ছেন যেন কেউ একজন। যা কিছু আমরা যেভাবে দেখছি, সেসবের ব্যাখ্যা আমাদের মননে অন্যভাবেও তো হতে পারতো, এসবের নীতি নির্ধারক বিবেক ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিতে পারতো। মানি বা না মানি সে কলকাঠির একটি আমরা প্রত্যেকেই, তারপরও কি বলবো আমাদের সবকিছুই তুচ্ছ, মূল্যহীন? যদি তা না হয় তাহলে কেন দাঁড়াই না সত্যের ছায়াতলে; যেখানে জীবনে-মরণে শান্তি!

-ফজলে এলাহি মুজাহিদ। ০১.০৭.২০০৬, মদীনা মুনাওয়ারা, সৌদি আরব।


________________________________________________________________
মূলপাতা - কবিতা - প্রবন্ধ - ভ্রমণ - নাটক - পছন্দের বই - ছবি

© - এই সাইটের সকল লেখার স্বত্ব লেখক কতৃর্ক সংরক্ষিত ।


fazal
fazal
Latest page update: made by fazal , Oct 18 2007, 2:23 AM EDT (about this update About This Update fazal Edited by fazal

26 words added

view changes

- complete history)
More Info: links to this page
There are no threads for this page.  Be the first to start a new thread.