তলা'আল বাদরু 'আলাইনাThis is a featured page


বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম


তলা'আল বাদরু 'আলাইনা
(আমাদের মাঝে পূর্ণ চাঁদের উদয়)


প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের শহর মদীনা আমার হৃদয়ে কোথায়, কিভাবে দাগ কেটেছে এবং এখানের কোথায় কি আছে, তা নিয়ে ধারাবাহিক এই লেখা।

ভূমিকাঃ

পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত হৃদয়ঃ

তলা'আল বাদরু 'আলাইনা - মিন সানিয়াতিল অদা'আ
অজাবাশ্ শুক্রু 'আলাইনা - মা-দা'আ লিল্লাহি দা'আ
আইয়ু্যহাল মাব'উসু ফি-না - জি'তা বিলআমরিল্ মোতা-'আ
জি'তা শার্রাফ্তাল মাদিনাহ্ - মার্হাবান্ ইয়া খাইরা দা'আ।

অর্থাৎ,
-আমাদের মাঝে পূর্ণিমার চন্দ্র উদিত হয়েছে সানিয়াতুল অদা'আ (মদীনার দক্ষিণে কুবার উপকন্ঠে অবস্থিত একটি জায়গার নাম) হতে।
-আমাদের শুকরিয়া আদায় করা উচিত ততক্ষণ পর্যন্ত, আহ্বানকারী যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্র পথে আহ্বান করতে থাকে।
-হে আমাদের মধ্যে প্রেরিত (মহাপুরুষ)! আপনি এমন বিষয় নিয়ে এসেছেন, যার আনুগত্য করা হয়।
- আপনি আগমন করে মদীনাকে সম্মানিত করেছেন, হে উত্তম দা'ঈ! (আল্লাহ্র পথে আহ্বানকারী) আপনাকে শুভেচ্ছা-স্বাগতম।

আহা! সেদিনের শিশুদের মাঝে যদি আমিও হতাম। তবে তো প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেতাম, শুনতে পেতাম তার কন্ঠের সুমধুর তিলাওয়াত, জীবন চলার পথ-নির্দেশ, দেখতে পেতাম আল্লাহ্র কালাম আল-কুরআনের জীবন্ত রূপ, সঙ্গ পেতাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের। মহান রব (প্রতিপালক)-এর প্রশংসায় আমার কন্ঠ উৎসর্গ, চৌদ্দ শতক পরের আমিও আজ তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহের পরশ লাভে ধন্য, তিনি (আল্লাহ্) আমায় দয়া করেছেন, আমার দো'আ কবূল করেছেন, আমি রাসূলের প্রতিবেশী, মদীনার বাসিন্দা, আল্হামদুলিল্লাহ্।
স্বদেশের মাটি পেরিয়ে বিশ্ব দেখবো, এ আকাংখা অনেক ছোট্টবেলা থেকেই। সেদিনের ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেত দু'টি ভিন্নধর্মী স্রোতে। 'যা কিছু দেখি, তাতেই সেরা হবো' -ভাবনার এ ধারা বেয়েই সেরা দাবাড়ু, গায়ক, অভিনেতা, খেলোয়াড় আরো আরো, প্রচেষ্টা কিছু থাকলেও সেসবের কিছুতেই আমার মন স্থায়িত্ব পায়নি এবং এ পথেই বিশ্ব দেখার প্রথম মন্যিল ভেবে রেখেছিলাম আমেরিকা। অন্য ধারায় বইতো দরবেশ দাদুর দরবেশ নাতি, প্রিয় শিক্ষকের (মক্তবের হুযুর) যোগ্য ছাত্র, যোগ্য আলেমের যোগ্য উত্তরসূরী, ভাবনা ভাবনাই রয়ে গেল, জীবন-জগৎ আমাকে এসবের কিছুই দিল না। ভাবনার জাল বুনতে বুনতেই প্রবাসী হলাম সৌদী আরবের বেদুঈন পল্লীতে। লোহিত সাগরের পানি ছুঁই ছুঁই করে গড়ে উঠা ছোট্ট মহকুমা উমলেজ, প্রথম সাগর দেখা, প্রথম মরুর পরশ, পৃথিবী দেখার প্রথম মঞ্জিল আমার।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নবী এটুকু ছাড়া তেমন পরিচিত ছিলাম না, আমার প্রথম পরিচয় প্রিয় নবীর সাথে, যখন আমি উমলেজের প্রবাসীদের একজন। 'সীরাত ইবনে হিশাম' এই জীবনী গ্রন্থখানিই আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয় একজন মানুষের সাথে, একজন সুহৃদের সাথে, একজন সুবিচারক শাসকের সাথে, একজন সুবিজ্ঞ সেনাপতির সাথে, একজন রাসূলের সাথে, একজন পরম বন্ধুর সাথে। লাইনের পর লাইন পেরিয়ে দুচোখের দৃষ্টি যতই এগিয়ে যাচ্ছে, মনের পৃথিবী যেন ততই বিশাল থেকে বিশালতায় হারিয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষের দেহ এবং আত্মা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেও তিনি রেখে যান তার মমতা, স্নেহ-ভালবাসা, শ্রম, জীবনের সবটুকু অর্জন, গোস্সা-কাঠিন্যতা-প্রবলতা, চরিত্র-কর্মের মাধুর্য ইত্যাদি ইত্যাদি। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়ছে, সাথে সাথে রচিত হচ্ছে আমার ক্ষুদ্র হৃদয়ে প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালবাসার ভিত। মনে পড়ে যখন শেষের পৃষ্ঠাগুলো পড়ছিলাম, পৃথিবীতে আসার পর থেকে এতটা ব্যথিত হয়ে কখনো কাঁদিনি, যতটা সেদিন কেঁদেছিলাম। যেন অন্ধকারে ছেয়ে গেল আমার সম্পূর্ণ পৃথিবী . . .। যেন ভাবতে পারছিলাম না মদীনায় এলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত পাবো না। বেদুঈন পল্লীর মসজিদে সালাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, হঠাৎ সেকেলে পরিবেশ দেখে সবকিছু গুলিয়ে ফেল্লাম, চৌদ্দশত বছরকে যেন চৌদ্দ বছর মনে হতে লাগল এবং কিভাবে কিভাবে যেন হিসাব-নিকাশ করে মনের মধ্যে এর সত্যতা দৃঢ় হতে শুরু করল। সালাতান্তে তো প্রায় এক বেদুঈনকে জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিলাম আর কি যে, 'তোমরা কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছিলে?' -কি কারণে যেন আবার সম্বিত ফিরে পেলাম। প্রিয় মানুষের প্রতি মানব-হৃদয়ের চিরন্তন আকুলতা বুঝি এমনি।

প্রথম সফরঃ
অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, যত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক, যত অর্থ সংকটই থাকুক, মদীনা যাবই ইনশাআল্লাহ্। প্রবাসী মাত্রই প্রথম দিনগুলো হয় কষ্টের, সংগ্রামের, তারপর ধীরে ধীরে আসে প্রতিষ্ঠার দিন। নতুন দিনগুলোতে মরুর নতুন অতিথি; তথাপি সংকল্পে ছিলাম অটল আর নির্ভরতার সবটুকুই ছিল প্রতিপালকে। সত্যিই, যে তাঁর উপর নির্ভর করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। শুরু হলো আমার যাত্রা; ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি (একদার)। ভাবাবেগের প্রাবল্যে মনে হতে লাগলো, মরুর বালির প্রতিটি কণা, খেজুর বাগানের প্রতিটি গাছ, আঁকা-বাঁকা পথের দু'ধারের প্রতিটি পাহাড়-পর্বত আমায় জানাচ্ছে 'আহ্লান ওয়াসাহ্লান' স্বাগতম-শুছেচ্ছা। এছাড়াও আমার অবস্থানস্থল উমলেজের বাইরে এটাই আমার প্রথম পদক্ষেপ।

অভিভূত! ঐ যে দু'চোখের সীমানায় ভেসে উঠলো মিনারগুলো। আমার প্রিয় দর্শন। মদীনার শহর-প্রান্ত ধরে বাসটি যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই আমার হৃদয়জুড়ে ঘনীভূত হচ্ছিল আবেগ, পৃথিবীর সমস্ত ভূমিতলের মাঝে আমার প্রিয় ভূমিতে আমি আজ প্রথম আসলাম, প্রথম দেখলাম। কতই না দেখেছি ছবিতে, আজ প্রথম দেখে যেন মনে হলো ছবিতে যাকিছু দেখেছি, সব জীবন্ত হয়ে এ মেহ্মানকে জানাচ্ছে সাদর অভিনন্দন। "আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!" ধ্বনিত হলো মহানের মহানত্ব, মাগরিবের সালাতের আহ্বান। কিছু দূরে, বাসষ্ট্যান্ডের পাশের একটা মসজিদেই তা আদায় করলাম। সালাতান্তে ধীরে-সুস্থে চলতে লাগলাম পৃথিবীর দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ স্থানের দিকে। আজ আমার অন্তর প্রশান্ত। খুব নয়, অনেকটা কাছাকাছি থেকে মিনারগুলোর মাঝখান যেন কাঁচের মনে হলো, আসলে আলোর প্রভাবেই এমন দেখালো। গলিপথ ধরে চলতে গিয়ে মনে পড়লো বার বার একটি গানের কলি- 'আমি যদি আরব হতাম, মদীনার ও পথ, যে পথে মোর চলে গেছেন নূর-নাবী হযরত'। এই তো সেই পথ, যে পথে কতই না চলেছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, চলেছেন তার প্রিয় সাহাবীগণ। কত ভালবাসতেন তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, তার কথার জবাবে তারা বলতেনঃ 'আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক', যাকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তারা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতেন নিজ নিজ পিঠ, তার প্রতিটি কথা শোনার জন্য তারা থাকতেন উদগ্রীব, তার সুন্দর মুখখানা আর মিষ্টি মুচকি হাসি দেখে তারা ভুলে যেতেন নিজেদের সমস্ত কষ্টকে। আমি সেই পথে চলছি, যেন স্বপ্নের ভেতর, সত্যিই কি আমি চলছি সেই পথে, সে--ই মসজিদে? যা ছিল একদা ক্ষুদ্র মদীনা থেকে শুরু করে অর্ধ পৃথিবীর সংসদ, বিচারালয়। জীবনের প্রিয় বাসনার বাস্তবতা টের পেয়ে আমি সিজ্দায় লুটিয়ে পড়লাম এশার সালাতে। এই প্রথম সালাম জানালাম তাকে, যিনি একদা এসেছিলেন এই পৃথিবীতে সমস্ত সৃষ্টির জন্য রহমত স্বরূপ। 'আস্সালাতু আস্সালামু 'আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আস্সালাতু আস্সালামু 'আলাইকা ইয়া হাবীবাল্লাহ্, আস্সালাতু আস্সালামু 'আলাইকা ইয়া সাইয়্যেদুল মুরসালীন, আস্সালাতু আস্সালামু 'আলাইকা ইয়া রাহ্মাতুলি্লল 'আলামীন'- সালাত এবং সালাম হে আল্লাহ্র রাসূল, হে আল্লাহ্র প্রিয় বন্ধু, হে নবী-রাসূলগণের নেতা, হে বিশ্ব-জাহানের রহমত!

সালাম জানালাম তার প্রিয় বন্ধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে; যিনি ছিলেন তার সুখ-দুঃখে, বিপদে আপদে ছায়ার মত সাথী, হিজরতের সঙ্গী। আরো সালাম জানালাম তার পাশে শায়িত সেই উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে; যিনি একদা নাঙ্গা তরবারী হাতে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে, আর সেই উমারই রাসূলের মৃতু্যর পর প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ব্যাথা এতই অসহনীয়ভাবে অনুভব করেছিলেন যে, তখনো নাঙ্গা তরবারী নিয়ে বলেছিলেন, 'যে বলবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন, তার রক্ষে নেই'! অবশেষে ধৈর্যের প্রতীক আবু বকর তাকে শান্ত করেন আল্লাহ্র বাণী শুনিয়েঃ

وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئاً وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ.

অর্থাৎ, "মুহাম্মদ একজন রাসুল মাত্র; তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছে। কাজেই যদি তিনি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহ্র ক্ষতি করবে না; বরং আল্লাহ্ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন।" [সূরা আলে-ইমরানঃ ১৪৪]
কি পরম বন্ধু ছিলেন তারা, দুনিয়াতেও সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম-লড়াইয়ে ছিলেন পাশাপাশি আর আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল 'কবর', এখানেও রয়েছেন পাশাপাশি। হে আল্লাহ্! আমাকে আপনার ও আপনার প্রিয় বন্ধুর বন্ধুত্বে ধন্য করুন এবং সন্তুষ্ট রাখুন, আমাদেরকেও। আমীন!


((((((((((((((((((((((((((শীঘ্রই পূর্ণাঙ্গ আসছে)))




________________________________________________________________
মূলপাতা - কবিতা - প্রবন্ধ - ভ্রমণ - নাটক - পছন্দের বই


fazal
fazal
Latest page update: made by fazal , Jul 8 2007, 1:18 AM EDT (about this update About This Update fazal Edited by fazal

13 words added

view changes

- complete history)
More Info: links to this page
There are no threads for this page.  Be the first to start a new thread.

Related Content

  (what's this?Related ContentThanks to keyword tags, links to related pages and threads are added to the bottom of your pages. Up to 15 links are shown, determined by matching tags and by how recently the content was updated; keeping the most current at the top. Share your feedback on Wetpaint Central.)