মানুষের স্বভাবই এমন যে, তাদের অধিকাংশের সামনে কোন কিছু পেশ করা হলে হয় অতিরঞ্জণে রঞ্জিত করে তাকে পূজো করা শুরু করবে; নয়তো অবমূল্যায়ণ করে তাকে সময়ের আস্তাকুঁড়ে ফেলে রাখবে। অবশ্যই মধ্যমপন্থা অবলম্বন বা যথোপযুক্ততা অনুধাবন করার মত যথেষ্ট মানুষ পৃথিবীতে সর্বকালেই ছিল, আছে এবং থাকবে; কারণ, তাদের দ্বারাই ভারসাম্য রক্ষা হয়ে থাকে। তারা অতি আবেগ তাড়িত হয়ে অন্ধও হয়ে যায় না, আবার অতি মোটা মাথা কিংবা স্থুলবোধীদের মত অননুধাবনপ্রবণ হয়ে দৃষ্টি মেলে দেখতে না পারার মতও নিঃস্পন্দন থাকে না। পৃথিবীর অতি সাধারণ ব্যাপার-স্যাপার থেকে নিয়ে শুরু করে বড় বড় ঘটনাবলীতেও এ বিভক্তি দৃশ্যমান; এমনকি জীবন ধারণের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাবলী তথা জীবন বিধান নিয়েও; বরং এ অতি ও নূন্য অনুধাবনের মাত্রা ধর্মসমূহে আরো অধিক হারে সংযোজিত হয়েছে।
যে কোন ব্যাপারেই আবেগ ও অবহেলাকে বর্জন করে বিবেক খাটিয়ে সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়াটাই শ্রেষ্ঠসৃষ্টি মানুষের জন্য শোভনীয়। ইসলামের মূলগ্রন্থ আল কুরআন তাই বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে তার অনুসারীকে একথা বুঝাতে সচেষ্ট হয়েছে যে, বিবেকবানদের জন্যই বিধিবিধান, বুদ্ধিমানগণের জন্যই উপদেশ এবং তারাই তা গ্রহণ করে ও করতে সক্ষম হয়। যেমন-
هَـذَا بَلاَغٌ لِّلنَّاسِ وَلِيُنذَرُواْ بِهِ وَلِيَعْلَمُواْ أَنَّمَا هُوَ إِلَـهٌ وَاحِدٌ وَلِيَذَّكَّرَ أُوْلُواْ الأَلْبَابِ.
((এটা মানুষের জন্য এক বার্তা, যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনিই একমাত্র ইলাহ্ আর যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।)) [সূরা ইব্রাহীমঃ ৫২]
এছাড়াও আরো দেখুন- সূরা আল-বাকারাঃ ২৬৯, সূরা আলে-ইমরানঃ ৭, সূরা আর্-রা'দঃ ১৯, সূরা সোয়াদঃ ১৯, সূরা আয্-যুমারঃ ৯, ১৮। মুহার্রাম মাসের দশ তারিখে মুসলমানদের একটা অংশ এবং কিছু উপদল ধর্মপালনের নামে যাচ্ছেতাই যা করে যাচ্ছে, তাকে যদি কেউ ইসলামের বিধিবিধানের আলোকে বিশ্লেষণ করে অথবা অন্ততঃ সাধারণ বুদ্ধিবিবেচনা খাটিয়েও চিন্তা করে, তাহলে ব্যক্তির বিবেচনায় তার অসারতা সুস্পষ্ট হতে বাধ্য।
মুহার্রাম মাস, হিজরী সালের প্রথম মাস। এ মাসে ঘটে যাওয়া ইতিহাস অনেক দীর্ঘ এবং বহুল তাৎপর্যপূর্ণ। তাই মুসলিম-অমুসলিম সকলের নিকটই এ মাসের গুরুত্ব সীমাহীন। শিয়া সমপ্রদায় এ মাসের দশ তারিখে যে মাতম বা শোক পালন করে, তার সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই; বরং কারো মৃতু্য বা হত্যার পর তার জন্য বেদনার্ত মনের অধৈর্যে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়ায় কোন বাধা নেই। কিন্তু মুখে আঘাত করে, হাত-পা ছুঁড়ে অথবা মিছিল করে এবং সেখানে বিভিন্নভাবে নিজেকে রক্তাক্ত করে বেদনা প্রকাশের অথবা প্রদর্শনের কোনই সুযোগ নেই, উপরন্তু কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ ((যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায়, বুকের কাপড় ছেঁড়ে এবং জাহেলী যুগের রীতি অনুযায়ী চিৎকার করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।)) [মুত্তাফাকুন 'আলাইহি; বুখারীঃ ১২৯৪, মুসলিমঃ ১০৩]
নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি হোসাইন রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হত্যাকাণ্ড মুসলিম ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা; সন্দেহ নেই। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ এ ঘটনা স্মরণ করে ব্যাথা অনুভব করে, কিন্তু এ জাতীয় ঘটনা এই একটিই নয়; এর পূর্বেও ঘটেছে অর্ধপৃথিবীর অধিপতি খ্যাত উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর শাহাদাতে; যাকে বলা হয় 'শহীদে মেহরাব', কারণ তাকে সালাতরত অবস্থায় ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তেমনি ঘটেছে উসমান যুন্নূরাইন (দুই নূরের অধিকারী) রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর শাহাদাতে; ঘটেছে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর শাহাদাতেও। তাই বলে কি এটাকে কেন্দ্র করে নতুন কোন ইবাদাতের উদ্ভাবন করতে হবে, কিংবা কোন নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদন শুরু করতে হবে? মুসলমানদের সর্বাবস্থায়ই মনে রাখা উচিত যে, ইসলামে 'ইবাদাত' সংক্রান্ত বিধান সম্পূর্ণ; এতে আর এক বিন্দু-বিসর্গও যোগ করার নেই। কেউ করলে তা হবে ইসলাম বহির্ভূত বিদ'আত অথবা অন্য কিছু। তবে ইসলামী শরীয়তের বিধিবিধানের বিশ্লেষণ ও যুগের চাহিদা মোতাবেক মূলনীতি ঠিক রেখে ব্যাখ্যা প্রদান বা ইজতিহাদ করা কিংবা কিয়াসের পর্যায় রয়েছে এবং থাকবে; কিন্তু তা কখনোই স্পষ্ট বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না। সুতরাং এ দিনে মুসলমানদের যা করণীয় সে সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ((রমাদানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সিয়াম হলো আল্লাহ্র মাস মুহার্রামের সিয়াম এবং ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ)।)) [মুসলিমঃ ১১৬৩]
এ সিয়াম হবে মুহার্রামের ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ; যে কোন দুই দিন। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হিজরত করে মদীনায় গমন করেন, তখন দেখতে পান যে, ইয়াহূদীরা মুহার্রাম মাসের দশ তারিখে সওম সাধনা করে। জিজ্ঞেস করা হলে তারা বললোঃ এ দিনে আল্লাহ্ ফির'আওনের কবল থেকে মূসা 'আলাইহিস্ সালামকে মুক্তি দেন এবং তাকে দরিয়ায় ডুবিয়ে মারেন; তাই তারা শুকরিয়া স্বরূপ সওম পালন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমরা মুসা 'আলাইহিস্ সালামের সাথে অধিক নিকট সম্পর্কিত, সুতরাং তিনি মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিলেন ইয়াহূদীদের বিপরীত করে একদিনের পরিবর্তে দু'দিন সিয়াম পালন করতে। [তিরমিযীঃ ৭৫৫]
এ সিয়ামের কল্যাণ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, ((এ দিনের সওম পালন করলে গত এক বছরের গোনাহ্ মাফ হয়ে যায়।)) [মুসলিমঃ ১১৬২] অন্য হাদীসে এসেছে, ((এ দিনের সওম এক বছরের সওমের ন্যায়।)) [সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ৩৬৩১]
পরিশেষে এটাই কাম্য আমার নিজের মধ্য থেকে এবং সকল মুসলমানদের মধ্য থেকেও যে, আমরা সকলে ইসলামের মূল উৎস থেকে জীবনের জন্য নিয়ম-পদ্ধতির সন্ধান করবো; এবং তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবো; সত্যপন্থী আলেমদের নিকট থেকে সহযোগিতামূলক নসীহত, প্রশ্নোত্তর ইত্যাদি গ্রহণ করবো। কেননা, আমাদের জীবনের জন্য যে, এটাই আমাদের স্রষ্টার পক্ষ থেকে একমাত্র মনোনীত বিধান। আর এর প্রতি আমাদের পরিপূর্ণভাবে মনোযোগ দেয়াই প্রমাণ করবে আমরা কি সত্যিই বোধশক্তিসম্পন্ন, না কি ভূমিকায় উল্লেখিত অন্ধ-আবেগী কিংবা গাফেল সমপ্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত? প্রিয় মুসলিম ভাই/বোন, তাই স্মরণ করুন আল্লাহ্র বাণীঃ
الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُوْلَئِكَ هُمْ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ.
((যারা মনোযোগের সাথে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে। তাদেরকে আল্লাহ্ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তারাই বোধশক্তি সম্পন্ন।)) [সূরা আয্-যুমারঃ ১৮] আল্লাহ্ আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
-ফজলে এলাহি মুজাহিদ।
২৯.০১.২০০৭, মদীনা মুনওয়ারা, সৌদি আরব।
© - এই সাইটের সকল লেখার স্বত্ব লেখক কতৃর্ক সংরক্ষিত ।