সওয়াবের নিয়তে ৩ মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা নিষেধ
-ফজলে এলাহি মুজাহিদ
সফর বা ভ্রমণ আমরা বিভিন্ন কারণেই করে থাকি। সেসবের মধ্যে দ্বীনী বিবেচনায় বা ধর্মীয় সফরে অবশ্যই পূণ্যাকাংখা বিদ্যমান থাকে এবং এই আকাংখা দোষণীয় নয়। কিন্তু যেহেতু ইসলাম এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম, যেখানে মূলনীতিগত ভাবে ক্ষুদ্র-বৃহৎ আর কোন কিছুরই সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন নেই। একথার প্রমাণ স্বয়ং আল্লার কিতাবে বিদ্যমান: ((আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।)) [সূরা আল-মায়েদা: ৩] এছাড়া কুরআন ও হাদীসের বহু দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে গবেষকগণ আল্লাহর নিকট নেক আমল বা সৎকর্ম কবূল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত সাব্যস্ত করেছেন- যার মধ্যে একটি হলো সৎকাজ সম্পন্ন হতে হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে। অন্যথা তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। দ্বীনী সফর বা ধর্মীয় ভ্রমণের ক্ষেত্রে তথা সওয়াব বা কল্যাণ অর্জনের জন্য যেসব সফর করা হয় সেসব ক্ষেত্রেও তা থেকে সওয়াব অর্জন ও তা আল্লাহর নিকট কবূল হওয়ার জন্য রাসূলের আনীত শিক্ষার অনুসরণের কোন বিকল্প নেই। দ্বীনী সফর বা ভ্রমণের উদ্দেশ্য হয় যিয়ারত, যার অর্থ হলো- পূণ্যস্থান দর্শন ও প্রদক্ষিণ, ভক্তিভরে দেখা ও প্রার্থনা করা ইত্যাদি এবং এই শব্দের ক্ষেত্রে বাস্তবে কবরস্থানও যোগ করা হয়েছে যেমন, নবীর কবর যিয়ারত। জাহেলী যুগে কাফের মুশরিকরা বিভিন্ন আলোচিত ব্যক্তিদের কবরে, মাজারে এবং পূণ্য হাসিল হয় বলে ধারণার প্রেক্ষিতে তেমন স্থান সমূহে যিয়ারত করত। বর্তমানেও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তা বিদ্যমান এবং সেসব থেকে প্রভাবিত হয়ে দ্বীন সম্পর্কে স্বল্প ধারণা নেয়া কিংবা অজ্ঞ মুসলমানগণও একই ধারায় বিভিন্ন ওলী-আউলিয়া ও পূণ্যবাণ ব্যক্তিবর্গের কবর-মাজার ইত্যাদির যিয়ারত করে আসছে। এই কাজকে কেউ কেউ তার দ্বীনের প্রায় পুরোটাই ধরে নিয়েছে, বিশেষ করে যারা কোন কিছুর প্রয়োজন হলেই অমুক মাজার, তমুক পূ্ণ্যস্থানের নামে মান্নত করে বসে এবং অর্থকড়ি যোগাড় করে সে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। এসব সিদ্ধান্তে তারা নিতান্তই নিজের অজ্ঞজনোচিত বিবেচনা এবং আশপাশের লোকজনের এক-আধখানা সত্যের সাথে হাজারো মিথ্যার মিশ্রিত মহালৌকিক রূপকথাকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এবং সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। অথচ একবারের জন্যও খুঁজে দেখতে চেষ্টা করে না যে, তার প্রভুর বিধান আলকুরআন-যেখানে তার সমস্ত জীবনের জন্য ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সকল প্রয়োজনের দিকনির্দেশনা বিদ্যমান–সেখানে কি বলা আছে পূণ্যের আশায় কোথাও ভ্রমণের ব্যাপারে?ইসলামের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য সে বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে গেছেন। তিনি বলেন: ((তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থানের প্রতি সফর করা যাবে না; (মসজিদগুলো হলো): মসজিদুল হারাম (মক্কার বায়তুল্লাহ্), এবং আমার এ মসজিদ (মদীনার মসজিদুন্ নববী), এবং মসজিদুল আকসা (ফিলিস্তীনের বায়তুল মাকদিস)।)) [বুখারী: ১১১৫, মুসলিম: ২৪৭৫]এই দলীলের ভিত্তিতে হজ্জ ও উমরায় আগমণকারী হাজীগণ মদীনায় আসবেন শুধুমাত্র মসজিদুন্ নববীতে সালাত আদায় করার নিয়তে; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ((আমার এই মসজিদের সারাত আদায় করা অন্যান্য মসজিদের চেয়ে এক হাজার গুণ উত্তম শুধুমাত্র মসজিদুল হারাম ব্যতীত।)) [বুখারী: ১১১৬] তাই মদীনায় যিয়ারত অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণের কবর যিয়ারত করার নিয়তে নয়; বরং মসজিদে সালাত আদায় করার নিয়তে। তবে হাঁ, কেউ মদীনা এসে পৌঁছে গেলে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মদীনায় অবস্থিত অন্যান্য সাহাবীগণের কবর যিয়ারত করতে পারবে। এটাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশেই: ((তোমরা কবর যিয়ারত কর, কারণ কবর যিয়ারত আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।)) [ইবনে মাজাহ: ১৫৫৮]নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে আরো বর্ণিত আছে যে: ((তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবরসমূহে নারী যিয়ারতকারিনীদের, সেখানে মসজিদ স্থাপনকারীদের এবং সেসবে (কবরসমূহে) বাতি জ্বালানোওয়ালাদের প্রতি অভিসম্পাত বর্ষণ করেছেন।)) [আবু দাউদ: ২৮১৭, তিরমিযী: ২৯৪, নাসায়ী: ২০১৬, আহমাদ: ১৯২৬, ২৪৭২, ২৮২৯, ২৯৫২]অথচ, কবরসমূহের উপর ইমারত নির্মিত হয়, মাজার হিসেবে ঘোষিত হয়, সেসব স্থানে সিজদা করা হয় যার কোন কোনটি হয় আল্লাহর জন্য আবার কোন কোনটি হয় কবরবাসীর জন্য, সেবব মাজারের প্রতি মানুষকে আহ্বান করা হয়, মান্নতের নামে প্রকাশ্যে সাধারণ জনগণের মাল-সম্পদ ডাকাতি করা হয়! এরপরও কি কোন মুসলমান সেসব স্থানের উদ্দেশ্যে সফর করতে পারেন? ইসলাম সম্পর্কে নিতান্ত মূর্খ ব্যক্তির দ্বারাই এমনতর সফর করা সম্ভব। সেজন্যই ইসলামের জ্ঞানার্জনের গুরুত্বকে ফরয বলে ঘোষণা করা হয়েছে, কেননা ইসলামকে মেনে চলতে হলে ওহীর জ্ঞানের বিকল্প নেই।এই পৃথিবীতে সবাই কম-বেশী চায় যে, তার মৃত্যুর পর তাকে লোকেরা স্মরণ করুক, কেউ কেউ চায় তার জন্য নানা ফলক-ইমরাত নির্মাণ করুক, অনেকে তো জীবিত থাকতেই প্রতিকৃতি প্রস্তুত করে রাখে। শুধুমাত্র নবীগণ এবং সকল সত্যপন্থী মুসলিম আলেমগণ এমনটি কখনোই চাননি। কেননা, তারা তাদের যাবতীয় সৎকর্ম শুধুমাত্র তাদের প্রতিপালক আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই সম্পাদন করেছেন। তাই তাদের মৃত্যুর পর কবর নিয়ে উৎসব হোক, একটা সুবিধাবাদী স্বার্থান্বেষী মহল তা থেকে ফায়দা হাসিল করুক এমনটি যেন না হয়, সেই সুদূর প্রসারী জ্ঞানের ভিত্তিতেই প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়ে গেছেন যে: ((তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহ বানিও না এবং তোমাদের গৃহগুলোকে কবর বানিও না।)) [মুসনাদে আহমাদ: ৮৪৪৯]সকল মুসলিমের প্রতি আহ্বান: আসুন, আমরা সত্যিকার ভাবে আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করি, যা আমাদের জন্য আমাদের সৎকর্মসমূহ আল্লাহর নিকট কবূল হওয়ার শর্ত। তাই আমরা শুধুমাত্র তিনটি মসজিদে সালাত আদায়ের নিয়তেই সফর করবো, এছাড়া অন্য কোন মাজারে, দরগায়, আজমীর ইত্যাদি ইত্যাদি স্থানে সফর করা থেকে বিরত থাকবো। কেননা, প্রথমঃ এটা আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিষেধ, দ্বিতীয়তঃ সেসব স্থানে শির্কের ছড়াছড়ি এবং যে কোন মুহূর্তে আপনিও পতিত হয়ে যেতে পারেন চাকচিক্যময় সে আগুনে!আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।০৮.০৮.২০০৭, মদীনা মুনওয়ারা, সৌদি আরব।